চট্টগ্রামের খাবারের জগতে এখন যে নামটি সবচেয়ে আলোচিত – মনজরুল হক। তার গল্পটা যেন একেবারেই সিনেমার মতো, বাবাকে হারানোর বেদনা ভুলতে নিজের জন্মদিনে (৯ জুলাই ২০১৩) তিনি খুলেছিলেন ছোট্ট একটি ক্যাফে— “বারকোড“। উদ্দেশ্য ছিল শুধুমাত্র মনকে শান্ত করা, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া, আর নিজের মতো সময় কাটানো। কিন্তু অজান্তেই সেই ছোট ক্যাফে পরিণত হয় চট্টগ্রামের ফুড কালচারের নতুন অধ্যায়ে।
আজ থেকে এক দশক আগে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল ছোট্ট এক কাপ কফি দিয়ে, এখন সেটি দাঁড়িয়ে গেছে ২০টির ও বেশি রেস্তোরাঁর বিশাল সাম্রাজ্যে যার মধ্যে ১৫টি চট্টগ্রামে, ৫টি ঢাকায় এবং একটি সংযুক্ত আরব আমিরাতে। শুধু তাই নয়, ৪০০ এরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেছেন তিনি। একটি ছোট ক্যাফেই বদলে দিলো তার জীবন। ভালো কফির অভাবে থাকা চট্টগ্রামের মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়লেন বারকোডে। কফির পাশাপাশি তৈরি হলো এক নতুন খাবার সংস্কৃতি।
২০১৫ সালের ২২ মার্চ। বারকোডের নতুন শাখা উদ্বোধনের এক রাত আগে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুরো রেস্তোরাঁ ছাই হয়ে যায়। এক কোটি টাকার সাজসজ্জা মুহূর্তে ধ্বংস। কিন্তু মনজরুল থামেননি। তার বিজনেস অবিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এক মাসের মধ্যেই নতুন নাম “বারকোড অন ফায়ার” নিয়ে আবার শুরু করলেন। সেই আগুন যেন নতুন করে জন্ম দিলো তার ব্র্যান্ডকে।

মনজরুল বিশ্বাস করতেন, খাবার শুধু পেট ভরায় না— এটা সংস্কৃতি বহন করে। তাই তার একের পর এক নতুন উদ্যোগ:
- স্বাস্থ্যকর ফুচকা প্ল্যাটার— ‘বার্গউইচ টাউন’।
- খাঁটি মেজবান খাবার— যাতে যে কেউ আসল স্বাদ পেতে পারে ‘মেজ্জান হাইলে আইয়ুন’।
- গ্রামীণ খাবারের স্বাদ— ‘বিরচট্টলা’।
- খাঁটি তেহারি— ‘তেহারিওয়ালা’।
প্রতিটি রেস্তোরাঁয় তিনি রেখেছেন আলাদা থিম।
মনজরুলের মতে, ব্যবসা মানে শুধু লাভ নয়। তিনি বলেন,
“আমাদের খাবারে কোনোদিন মেয়াদোত্তীর্ণ বা নষ্ট উপকরণ ব্যবহার হয়নি। বিরচট্টলা আর মেজ্জান হাইলে আইয়ুন এ ফ্রিজ পর্যন্ত নেই। প্রতিদিনের রান্না প্রতিদিনই শেষ করি।”
এই সততাই আজ তার ব্র্যান্ডকে অনন্য করেছে।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় রেস্তোরাঁ শিল্পের জন্য ছিল ভয়াবহ। কয়েক কোটি টাকার লোকসান গুনেও তিনি কর্মীদের বেতন ও ভাড়া চালিয়ে যান ঋণ নিয়ে। মনজরুলের মতে, এই সময়টা শিখিয়েছে ধৈর্য আর পরিকল্পনা কীভাবে ব্যবসার মূল চাবিকাঠি।

তিনি শুধু দেশীয় ঐতিহ্যবাহী খাবারেই সীমাবদ্ধ নয়, তার রয়েছে প্রিমিয়াম কন্টিনেন্টাল রেস্তোরাঁ ‘ওমেট্রা’। এখানে রয়েছে তেহারি থেকে আন্তর্জাতিক মানের হাই-এন্ড খাবার— সব শ্রেণির মানুষের জন্য।
সম্পূর্ণ বাংলাদেশে বারকোডের জনপ্রিয় খাবারের তালিকার মধ্যে শীর্ষে রয়েছেঃ
- চিকেন স্টেক মিল
- ইংলিশ রোস্ট চিকেন
- ফুচকা প্ল্যাটার
- দোসা
- মেজবান
চট্টগ্রামের খাবারের অঙ্গনে মনজরুল হকের অবদান এখন কিংবদন্তির পর্যায়ে। কফির স্বাদ থেকে শুরু করে ঐতিহ্যবাহী মেজবান— সবখানেই তিনি এনেছেন এক নতুন ধারা। তার গল্প প্রমাণ করে যে ব্যক্তিগত বেদনা থেকেও উঠে দাঁড়িয়ে কীভাবে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া যায়।



