🗓️ তারিখ: শনিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৫

একসঙ্গে এইচএসসি পাস করলেন বাবা-মেয়ে
নাটোরের লালপুরে এক হৃদয়স্পর্শী ঘটনায় আলোচনায় এসেছেন এক বাবা ও তার মেয়ে। দুজনই একই সঙ্গে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে একসঙ্গে পাস করেছেন— যা সামাজিক মাধ্যমে এখন অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
লালপুর উপজেলার গোপালপুর পৌরসভার নারায়ণপুর গ্রামের বাসিন্দা মৃত লাল মিয়ার ছোট ছেলে আব্দুল হান্নান (৪৩)। তিনি এ বছর বাঘা কাকড়ামারি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। একই পরীক্ষায় তাঁর মেয়ে হালিমা খাতুন অংশ নেন গোপালপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে। ফলাফল প্রকাশের পর দেখা যায়— বাবা-মেয়ে দুজনই উত্তীর্ণ হয়েছেন।
এই অনন্য সাফল্যের গল্প শুরু হয় বহু বছর আগে। ১৯৯৮ সালে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস হাই স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন আব্দুল হান্নান। এরপর সংসার জীবনে প্রবেশ করে শিক্ষা জীবন থেমে যায়। কিন্তু শিক্ষা অর্জনের তীব্র আগ্রহ তাঁর ভেতরে রয়ে গিয়েছিল।
দীর্ঘ ২৫ বছর পর, ২০২৩ সালে রুইগাড়ি হাই স্কুল থেকে আবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সফলভাবে পাস করেন তিনি। সেই সময় তাঁর মেয়ে হালিমা একই বর্ষে পরীক্ষায় অংশ নেন। এবার দুজন একসঙ্গে এইচএসসি পরীক্ষায় বসে ইতিহাস গড়লেন।
আব্দুল হান্নান বলেন,
“আমি ছোটবেলায় পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হই। কিন্তু মনে সবসময় একটা আফসোস ছিল। মেয়ের উৎসাহ আর পরিবারের সহযোগিতায় আবার বই হাতে নেই। আজ আমি গর্বিত, কারণ আমার মেয়ের সঙ্গে একই সার্টিফিকেট হাতে পেলাম।”
মেয়ে হালিমা খাতুনও বাবার এই সাফল্যে ভীষণ উচ্ছ্বসিত। তিনি বলেন,
“বাবা আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। সংসারের কাজ, দায়িত্ব— সব সামলে তিনি পড়াশোনা করেছেন। আমি চাই আমরা একসঙ্গে মাস্টার্স পর্যন্ত পড়ি।”
স্থানীয় লোকজনের ভাষায়, এই গল্প শুধু একটি পরিবারের নয়— এটি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার প্রতীক। শিক্ষার কোনো বয়স নেই— এই সত্যটি নতুন করে প্রমাণ করেছেন আব্দুল হান্নান।
লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান বলেন,
“আব্দুল হান্নান প্রমাণ করেছেন যে শেখার কোনো শেষ নেই। তাঁর এই সাফল্য আমাদের সমাজের জন্য অনুপ্রেরণা। আমরা তাঁকে অভিনন্দন জানাই এবং ভবিষ্যতের পড়াশোনায় সহায়তার আশ্বাস দিচ্ছি।”
স্থানীয় কলেজের অধ্যক্ষরা জানান, এই ঘটনা শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। অনেকেই এখন ভাবছে, জীবনের যেকোনো পর্যায়ে ইচ্ছাশক্তি থাকলে শিক্ষা অর্জন সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন ঘটনা গ্রামীণ শিক্ষার চিত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া তরুণদের জন্য এটি নতুন দৃষ্টান্ত।
এদিকে সামাজিক মাধ্যমে ইতোমধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে এই বাবা-মেয়ের ছবি ও গল্প। অনেকেই শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন, কেউ লিখেছেন— “এই গল্প বাংলাদেশের গ্রামীণ শিক্ষা ব্যবস্থার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।”
আব্দুল হান্নান ও হালিমার লক্ষ্য এখন স্পষ্ট— তাঁরা দুজনেই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে সমাজে অন্যদের অনুপ্রেরণা জোগাতে চান। তাঁদের গল্প প্রমাণ করেছে, মন থেকে চাইলে অসম্ভব কিছুই নয়।
Read more: স্কুলে পড়ার বয়সে প্রতিষ্ঠিত করলো স্কুল শিশু সিরাজ ও তার বোন মুস্কান


